মোহাম্মদ সোহেল রানা: বাংলাদেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত জামালপুর। সাত উপজেলা নিয়ে গঠিত এ অঞ্চল দেশের ২০তম জেলা। কৃষি প্রধান এ জেলার প্রধান ফসলের মধ্যে ধান, পাট, আখ, সরিষা, ভুট্টা, চিনাবাদাম এবং গম উল্লেখযোগ্য। এ অঞ্চলের বিখ্যাত জিনিসের মধ্যে শীর্ষে আছে নকশিকাঁথাই। দেশজুড়ে খ্যাতি রয়েছে জামালপুরের নকশিকাঁথার। শুধু তাই নয় বর্তমানে নকশিকাঁথা এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও রফতানিও হচ্ছে। জেলাটির দারিদ্র্য বিমোচনে এ শিল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নকশিকাঁথাকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জার্নাল প্রকাশ করে শিল্প মন্ত্রণালয়।
সাধারণ কাঁথার ওপর নানা ধরনের নকশা করে বানানো বিশেষ প্রকারের কাঁথাই হচ্ছে নকশিকাঁথা। কাঁথাকে জামালপুরের আঞ্চলিক ভাষায় খেতা নামেও ডাকা হয়। সাধারণত পুরনো কাপড়, শাড়ি, লুঙ্গি দিয়ে কাঁথা তৈরি করা হয়। পুরাতন কাপড়ের পাড় থেকে সুতা তুলে অথবা তাঁতিদের থেকে রঙিন সুতা কিনে কাঁথার জন্য সেলাই করা হয়। সাধারণ কাঁথা সেলাইয়ের পর এর ওপর বিভিন্ন নঁকশা ফুটিয়ে তোলা হয়, যার মধ্যে থাকে ফুল, লতা, পাতা ইত্যাদি।
নকশিকাঁথা ছাড়া এ জামালপুরের হস্তশিল্পের অন্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে- শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, টি-শার্ট, ফতুয়া, চাদর, ওয়ালমেট, কুশন কভার, বালিশের কভার, ফ্লোর কুশন, মানি ব্যাগ, শিকা ইত্যাদি।
এক সময় জামালপুরের গ্রামীণ বিয়েতে অনিবার্য ছিল নকশিকাঁথা। এ অঞ্চলে নতুন কণেকে শ্বশুর বাড়িতে পাঠানোর সময় নকশিকাঁথা দেওয়ার প্রচলন ঐতিহ্যগতভাবে চলে আসছে। তবে সময়ের সঙ্গে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা এই নকশিকাঁথা শিল্প আবারও জেগে উঠতে শুরু করেছে জামালপুরে। নকশি সূঁচি শিল্পের বাণিজ্যিক প্রসারে এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র কিছুটা বদলে গেছে বলা যায়। আশির দশকের শুরুর দিকে জামালপুরে এই শিল্পের বাণিজ্যিক প্রসার শুরু হয়। বর্তমানে জেলায় অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের স্কুল-কলেজের ছাত্রী এবং গৃহিণীরা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন।
এ শিল্পকে কেন্দ্র করে জামালপুরেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি জেলা শহরেও ছোট-বড় অনেক শো-রুম রয়েছে। বর্তমানে জেলাজুড়ে প্রায় অর্ধলক্ষ নারী-পুরুষ এই পেশায় যুক্ত আছেন। এতে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে অনেক দরিদ্র গৃহিণী। সংসারের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি তারা ঘরে বসেই নানা রকম নকশি সামগ্রীর সূচিকর্ম করছেন। এ ছাড়া পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রীরাও এ শিল্পের কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। নকশি পণ্যের কদর বাড়ায় বাড়তি আয়ের জন্য অনেক শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিনীরাও এখন এ কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
উদ্যোক্তাদের সূত্রে জানা গেছে, একটি নকশি কাঁথা তৈরি করতে মজুরিসহ ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা খরচ হয়ে থাকে। ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা তা কিনে নেয় ২ হাজার টাকা বা কাছাকাছি মূল্যে। এই কাঁথা ঢাকার বড় দোকানগুলোতে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। বিপণন সমস্যার কারণে উদ্যোক্তারা পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, একই সাথে যথাযথ মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শ্রমিকরা। তাই মালিকের দেয়া অল্প মজুরিতেই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ সহায়তা পেলে এখানকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সরাসরি এসব সূঁচি পণ্য ঢাকাসহ বড় শহরে নিজেরাই বিপণন করতে পারবে। শুধু তাই নয় রফতানি করতে পারবে বিদেশেও। দেশের গার্মেন্ট শিল্পের পরেই জামালপুরের এ শিল্প দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে প্রত্যাশা উদ্যোক্তাদের। এ ছাড়া শ্রমিকরাও যেমন সঠিক পারিশ্রমিক পাবেন, পাশাপাশি এ জেলার গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্রও পুরো পাল্টে যাবে।
