নয়ন আসাদ ||
মুসলিম দেশগুলোর পরমাণু উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেন এক নিষিদ্ধ ফল। এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ চেয়েছিল নিজেদের প্রতিরক্ষা জোরদার করতে, আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে অথবা পশ্চিমা হুমকির বিরুদ্ধে নিজেদের ঢাল তৈরি করতে সেই নিষিদ্ধ ফল ছুঁতে । কিন্তু তাদের প্রতিটি উদ্যোগের পথ আগলে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। কখনও আকস্মিক হামলা চালিয়ে, কখনো কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে, আবার কখনও গুপ্তহত্যা ও সাইবার আক্রমনের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মুসলিম দেশ যেন কখনোই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত না হয়।
এই দীর্ঘ সংগ্রামের চারটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচির উত্থান ও পতনের ইতিহাস যেন মুসলিম দেশগুলোর রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিষাদময় দলিল। কারণ পরমাণু শক্তিধর হতে চাওয়া তিনটি দেশই আজ ক্ষত-বিক্ষত।
ইরাক
সত্তর দশকের শেষ দিক। সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে ইরাক তখন পারমাণবিক শক্তি অর্জনের এক বিশাল স্বপ্ন দেখছিল। ফ্রান্সের সহায়তায় শুরু হয়েছিল “অসিরাক” নামের এক পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর নির্মাণের কাজ। ইরাক অবশ্য বারবার দাবি করছিল, এটি নিছকই গবেষণাভিত্তিক এবং শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে। কিন্তু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সে পথে আগাতে দেয়নি
১৯৮১ সালের ৭ জুন ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ইরাকে অকস্মাৎ অভিযান চালায়, যার নাম ছিল ‘অপারেশন অপেরা’। ইরাকের বাগদাদের বাইরে থাকা অসিরাক রিঅ্যাক্টরে মুহূর্তের মধ্যে নেমে আসে বোমাবর্ষণ। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিশাল সেই রিঅ্যাক্টর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। ইসরায়েল এই হামলাকে “প্রতিরক্ষামূলক আগাম ব্যবস্থা” হিসেবে আখ্যা দিলেও, আন্তর্জাতিক মহলে এর বিরুদ্ধে ওঠে তীব্র সমালোচনার ঝড়। কিন্তু নিন্দার পরোয়া তারা কখনোই করে না। আর এই হামলার মাধ্যমেই কার্যত ইরাকের পরমাণু স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটে।
পরবর্তী এক দশকে ইরাক নানাভাবে সেই প্রকল্প পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করলেও, ১৯৯১ সালের গালফ যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে ২০০৩ সালের মার্কিন আগ্রাসনে সাদ্দাম হোসেনের সরকার সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যায়। পরমাণু প্রকল্প শুধু থেমেই যায়নি, ইরাক নিজেই এক ভঙ্গুর ও যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
সিরিয়া
ইরাকের মতো সরব না হলেও, সিরিয়া পরমাণু শক্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছিল এক গভীর গোপনীয়তার আবরণে। ২০০০-এর দশকের শুরুতে দেশটি উত্তর কোরিয়ার সহায়তায় আল-কিবার নামের এক প্রত্যন্ত এলাকায় একটি পরমাণু রিঅ্যাক্টর নির্মাণ শুরু করে। প্রকল্পটি ছিল একেবারেই গোপন। কিন্তু মোসাদের হাতে এক সিরিয়ান কর্মকর্তার কম্পিউটার হস্তগত হলে ইসরায়েল সব তথ্য পেয়ে যায়।
২০০৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাতে ইসরায়েল আরেকটি গোপন অভিযান চালায়, যার কোড নাম ছিল ‘অপারেশন অরচার্ড’। সিরিয়ার ওই রিঅ্যাক্টরে মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণ করা হয়। রাতের অন্ধকারে নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যায় নির্মাণাধীন স্থাপনা। ইসরায়েলের এই হামলায় সিরিয়ার সেই গোপন কর্মসূচি চিরতরে থেমে যায়। এর কিছুদিন পরই সিরিয়ার মাটিতে শুরু হয় এক ভয়ংকর গৃহযুদ্ধ, যা আজও থামেনি।
লিবিয়া
মুয়াম্মার গাদ্দাফির লিবিয়া ছিল আরেকটি রাষ্ট্র যা চুপিসারে পরমাণু অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছিল। পাকিস্তানি পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এ. কিউ. খানের নেতৃত্বে গঠিত পরমাণু বিস্তারের চক্র থেকে লিবিয়া অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সংগ্রহ করে। তারা গোপনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প চালাতে থাকে। তবে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণের পর গাদ্দাফি বুঝতে পারেন, এই পথে এগোলে তার পরিণতিও সাদ্দামের মতোই হতে পারে।
সেই উপলব্ধি থেকেই গাদ্দাফি এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নেন। তিনি স্বেচ্ছায় তার সমস্ত পরমাণু কর্মসূচি বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সমঝোতা করে সব প্রযুক্তি ও ডকুমেন্ট হস্তান্তর করেন। পশ্চিমা বিশ্ব এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানায় এবং এর ফলে গাদ্দাফির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও কিছুটা বাড়ে। এ যেন ছিল আমেরিকা-ইসরায়েলের কূটনীতির এক জয়, যেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই একটি পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে থামিয়ে দিয়েছিল কিন্তু যে আশংকায় গাদ্দাফী এই প্রকল্প থেকে সরে এসেছিলেন, সেই পরিণতি ঠিকই নেমে এসেছিল তার ভাগ্যে।
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস ঘটে ২০১১ সালে। আরব বসন্তের ঢেউ লিবিয়াতেও আছড়ে পড়ে। জনতার বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে NATO, গাদ্দাফির বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। ফলাফল—গাদ্দাফি নিহত হন, লিবিয়া সম্পূর্ণ তছনছ হয়ে যায়, এবং আজও রাজনৈতিকভাবে দেশটি টুকরো টুকরো অবস্থায় রয়েছে। এই ঘটনার পর অনেক বিশ্লেষকই মন্তব্য করেন, গাদ্দাফি হয়তো ভুল করেছিলেন পরমাণু কর্মসূচি বিলুপ্ত করে তিনি নিজের শেষ শত্রুদের আরও সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
ইরান: টিকে থাকা একমাত্র প্রতিযোগী
মধ্যপ্রাচ্যের অন্য সব দেশ পরমাণু শক্তির প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে গেলেও ইরান এখনো সেই মঞ্চে টিকে রয়েছে। ইসলামী বিপ্লবের পর একসময় থেমে যাওয়া কর্মসূচি নব্বইয়ের দশকে নতুন করে শুরু হয়। ইরান সবসময় দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, শুধুই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি- এটি আসলে পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রকল্প।
ইসরায়েল বহু বছর ধরে ইরানকে থামাতে নানা পথ অবলম্বন করে। ২০১০ সালে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে স্টাক্সনেট (Stuxnet) নামের একটি অত্যাধুনিক সাইবার অস্ত্র তৈরি করে, যা ইরানের নাতাঞ্জ পরমাণু স্থাপনায় চালানো হয়। এই সাইবার আক্রমণে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ বিকল হয়ে পড়ে, যা ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এর পাশাপাশি ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানীদের একে একে হত্যা করা হয়, যেগুলোর পেছনে মোসাদের হাত ছিল বলে আন্তর্জাতিক মহলে অনুমান করা হয়।
২০১৫ সালে ইরান ও ৬টি পরাশক্তির মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি (JCPOA) স্বাক্ষরিত হয়, যার আওতায় ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করতে রাজি হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে সরে যায়। আর অবশেষে ইসরাইল-আমেরিকা যৌথভাবে হামলা করে প্রধান প্রধান পরমাণু স্থাপনায়। হত্যা করে প্রধান পরমাণু বিজ্ঞানীদের। এতে ঠিক কতটুকু ক্ষতি হয়েছে ইরানের তা এখনো যদিও স্পষ্ট নয় তবে এই সামরিক হস্তক্ষেপ তাদের কর্মসূচীকে যে বেশ পিছিয়ে দিয়েছে তাতো বলাই যায়। এখন দেখার বিষয় সামনে দেশটি কিভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেয়।
অপরদিকে বলা হয়, ইসরাইল নিজেই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র, অথচ কোনো চুক্তির আওতায় নেই, কোনো পরিদর্শনের আওতায়ও নয়। কিন্তু কোনো মুসলিম দেশ সেই পথে যেতে চাইলে, তখন তা “বিশ্বশান্তির হুমকি” বলে আখ্যা দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেই যায়- এটা কি কেবল পরমাণু অস্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান, না কি এক নির্দিষ্ট ভূগোল ও সংস্কৃতিকে সবসময় অসহায়, নিরস্ত্র ও নির্ভরশীল করে রাখার একটি কৌশল?
সত্য হলো, বিশ্ব কূটনীতি অনেক সময় নৈতিকতার ভাষা ব্যবহার করলেও তার ভেতরে কাজ করে ভয়, আধিপত্য ও শক্তির রাজনীতি। আর সে খেলায় মুসলিম রাষ্ট্রগুলো বারবার লক্ষ্যবস্তু, প্রতিবার নতুন কৌশলে।
